রীনা সুলতানা: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এই শিল্প আজ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সাল থেকে এলডিসি সুবিধার আওতায় ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার পর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ডেনিম, ট্রাউজার, টি-শার্টের মতো কিছু পণ্যে বাংলাদেশ চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান হয়ে ওঠে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই বাজারে প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-ডিসেম্বর) ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ কম। নিটওয়্যার পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং ওভেন পণ্যের রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এই নেতিবাচক প্রবণতা রপ্তানিকারকদের মধ্যে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপের মধ্যে প্রতিযোগী দেশগুলো বাড়তি প্রণোদনা দিয়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি এবং মজুরি বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। অন্যদিকে চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম নিজেদের শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে নীতিগত সহায়তা ও নগদ প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে যে বাণিজ্য স্থানান্তর ঘটেছে, বাংলাদেশ তা থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা নিতে পারেনি। ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা কিছু আফ্রিকান দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ইইউ বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, কিন্তু বাংলাদেশ ধীর নীতিগত পদক্ষেপ, সীমিত বাজার বৈচিত্র্য এবং পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে পিছিয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, মার্কিন বাজারে উচ্চ শুল্ক বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো কৌশলগতভাবে ইইউ বাজারের দিকে ঝুঁকেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের রপ্তানি আশাব্যঞ্জক নয়, যা বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদ্য ঘোষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন এক বড় শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রায় দুই দশকের আলোচনার পর এই চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা। ইউরোপীয় কাউন্সিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ভারতের সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে এটি ২০২৭ সালে কার্যকর হবে। চুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় পোশাকপণ্যের ওপর ইউরোপের বিদ্যমান প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। একইসঙ্গে চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক পণ্য, হস্তশিল্প ও গয়নার মতো খাতেও শুল্ক কমানো হবে বা বিনা শুল্কে প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল ঘোষণা করেছেন, এই চুক্তির ফলে ইউরোপে ভারতের টেক্সটাইল রপ্তানি দ্রুতই ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩০-৪০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়া সম্ভব হবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক ব্যবসার বড় অংশ ভারতের দখলে চলে যাবে বলে দিল্লি আশা করছে। বাংলাদেশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে পাঠিয়েছে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৯৭১ কোটি ডলার। কিন্তু ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের এই সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে। প্রতিযোগিতামূলক দাম ও পণ্যের মানের কারণে ভারত দ্রুত ইউরোপীয় বাজারে অবস্থান শক্ত করবে। বাংলাদেশ যেখানে এখনও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, মজুরি বৃদ্ধি এবং সীমিত বাজার বৈচিত্র্যের সমস্যায় ভুগছে, সেখানে ভারত বাড়তি প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা নিয়ে এগোচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক খাত আরও চাপের মুখে পড়বে। ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বাইরে গিয়ে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স উন্নয়ন এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করা। পাশাপাশি লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং ইইউসহ বড় বাজারের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় গতি আনা জরুরি। তিনি সতর্ক করেছেন, সময়োপযোগী ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ না করা হলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বাংলাদেশ আরও বেশি বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন শুধু একটি বড় বাজার নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবস্থান ধরে রাখার পরীক্ষাক্ষেত্র। প্রতিযোগী দেশগুলো যখন দ্রুত নীতি পরিবর্তন ও প্রণোদনা দিয়ে নিজেদের শক্ত করছে, তখন বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে এগোতে হবে। নইলে প্রতিযোগিতার চাপে ইউরোপে বাজার হারানোর শঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজার বৈচিত্র্যকরণ এবং মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি। শুধু পোশাকের ওপর অতিনির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন খাত যেমন টেকসই টেক্সটাইল, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। একইসঙ্গে ইইউর সঙ্গে নিজস্ব বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় গতি আনা জরুরি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে ইইউ বাজার সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভারতের নতুন চুক্তি বাংলাদেশের জন্য দ্বিগুণ চাপ তৈরি করেছে। একদিকে উৎপাদন ব্যয় ও নীতিগত দুর্বলতা, অন্যদিকে প্রতিযোগীদের বাড়তি সুবিধা-এই দুইয়ের সমন্বয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

